সাজিদুর রহমান, জগন্নাথপুর টাইমস ডেস্কঃ
বিজয়ের মাসে বিজয়ের আলো জ্বালিয়ে ইতিহাসের বুক চিরে আবারও ফিরে এলো একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। ১৩ই ডিসেম্বর, শনিবার পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে বিলেতে বসবাসরত একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে আয়োজিত বিজয় উৎসব ছিলো কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়—ছিলো আত্মত্যাগ, স্মৃতি আর শপথের মিলনমেলা। এই উৎসবে মুক্তিযোদ্ধারা আবারও দৃঢ়তার সাথে উচ্চারন করেছেন, একাত্তরের চেতনাই আমাদের পথচলার দীপশিখা।
লাল-সবুজের পতাকার ছায়ায় উৎসবে বীরদের চোখে ঝিলিক দিয়েছে অতীতের রণাঙ্গন, কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে উঠেছে স্বাধীনতার গান। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার আবেশে উপস্থিত প্রজন্ম অনুভব করেছে—স্বাধীনতা কোনো গল্প নয়, এটি রক্তে লেখা জীবন্ত সত্য।
এই বিজয় উৎসবে শহীদদের স্মরণে নীরবতা ছিলো গম্ভীর, আর ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলার প্রত্যয় ছিলো দৃঢ়। মুক্তিযোদ্ধাদের হাত ধরে ইতিহাস যেন অনুষ্ঠানে আবার কথা বলেছে—বলেছে মানবতা, বলেছে ন্যায়, বলেছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন।
বিজয়ের এই উৎসব যেন উপস্থিত দর্শক স্রোতাদের মনে করিয়ে দিলো স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই শেষ হয়নি, বিজয়ের চেতনাই আমাদের পথচলার দীপশিখা। এই আলো নিয়েই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
শনিবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গান, কবিতা আলোচনায় চলে মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিজয় উৎসব। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও টিভি উপস্থাপিকা উর্মী মাজহার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উৎসবের সভাপতি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাই কমিশনার গিয়াসউদ্দিন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নিরবে মঞ্চে এসে দাঁড়ান উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এ সময় মঞ্চের দুপাশের বড় পর্দায় ভেসে উঠে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের ভাষন – এবারের সংগ্রাম – আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম – স্বাধীনতার সংগ্রাম।
এরপর ড. শ্যামল চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সমবেত কণ্ঠে রণাঙ্গনের জনপ্রিয় গান পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে – রক্ত লাল রক্ত লাল এবং নোঙর তোল তোল / সময় যে হোল হোল পরিবেশন করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য ছিলেন দেওয়ান গৌস সুলতান, লোকমান হোসেন, ফয়জুর রহমান খান, মাহমুদ হাসান এমবিই, ইঞ্জিনিয়ার মেফতাহুল ইসলাম, আলাউদ্দিন, আফতাব উদ্দিন নাসির, সাদউদ্দিন, আবু মুসা হাসান, হিমাংশু গোস্বামী, ফেরদৌস খান ও শহিদুল ইসলাম বাবলু।
এর পর মঞ্চে সমবেত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় ফুল পরিয়ে দেন নব প্রজন্মের শ্রেয়সী ও স্মৃতি আজাদ।
বি বি সি ও ভয়েস অফ আমেরিকার সাবেক সাংবাদিক শামীম চৌধুরী ও মাসুদ হাসান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যালামনাই ইন দ্যা ইউ কে এর সভাপতি সিরাজুল বাসিত চৌধুরী, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি সৈয়দ এনামুল ইসলাম, এমদাদ তালুকদার এম বি ই, প্রশান্ত পুরকায়স্থ বি ই এম, শেরওয়ান চৌধুরী, সত্যবাণী অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা, বার্তা সম্পাদক নিলু হাসান, ম্যানেজিং এডিটর সৈয়দা ফেরদৌসি পাশা, কবি হামিদ মোহাম্মদ,কবি মজিবুল হক মনি প্রমুখ উৎসবে উপস্থিত ছিলেন ।অনেক মুক্তিযোদ্ধা সপরিবারে যোগদান করেন এই বিজয় উৎসবে।
অত্যান্ত উপভোগ্য এই উৎসবটি শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষন ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সভামঞ্চে উপবেশনের মাধ্যমে। মন্চ সজ্জা ছিল দৃষ্টি কাড়া, চিরায়ত গ্রাম বাংলার প্রাচিন এক বটবৃক্ষের পাশে বিশাল ‘অপরাজেয় বাংলার’ ভাস্কর্য , তার দু’পাশে বিশাল দু’টি স্ক্রিনে প্রদর্শিত হচ্ছিল ফেলে আসা স্বদেশের প্রকৃতির দৃশ্যবলি। গতানুগতিক বক্তৃতার পরিবর্তে ছিল একাত্তরের সঙ্গিত ও নৃত্যের ফাঁকে ফাঁকে কথা ও কবিতা, এরই মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত আলোচনা। স্বাগত বক্তব্যে রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান। বর্তমান বৈরি সময়ের উল্লেখ করে আবেগ ও সাহসী উচ্চারন ছিল তাঁর কন্ঠে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফয়জুর রহমানের কন্ঠেও ছিলো একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা বক্তব্য। উপস্থিত সুধীজনদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লোকমান হোসেন।
ধর্ম ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্বে স্বাধীনতার অর্জন ক্ষতিগ্রস্থ বা বাধাগ্রস্ত উল্লেখ করে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক ডা. শাহাদুজ্জামান।
